সুনামগঞ্জ জেলা ডটকম একটি তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেটি ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ—দুই মাধ্যমেই এটি সবার কাছে সুনামগঞ্জ জেলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, পর্যটন, খবর এবং ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এইচ. কে. মামুন, যিনি একটি আধুনিক ও সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে সুনামগঞ্জকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।
আমাদের অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের বৈশিষ্ট্য:
🔹 সুনামগঞ্জ জেলার জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর তথ্য
🔹ডাক্তার ও হাসপাতালের তথ্য
🔹রক্তদান ও রক্তের খোঁজ
🔹গাড়ি ভাড়া ও লোকাল পরিবহন
🔹জরুরি নম্বর
🔹চাকরির তথ্য
🔹উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সুযোগ
🔹বাসের সময়সূচি, দর্শনীয় স্থান, ক্রয়-বিক্রয়, মিস্ত্রির খোঁজ 🔹 সুনামগঞ্জকে তথ্যপ্রযুক্তির আলোয় আলোকিত এবং সহজ করে দেওয়া। 🔹 ছবি ও ভিডিও গ্যালারি 🔹 স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিবরণ 🔹 ব্যবহারকারী বান্ধব ডিজাইন ও সহজ নেভিগেশন 🔹 নিয়মিত আপডেট ও বিশ্বস্ত তথ্য সরবরাহ
আমরা বিশ্বাস করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটনকে তুলে ধরা সময়ের দাবি। তাই আপনারা আমাদের ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ভিজিট করে সুনামগঞ্জকে নতুনভাবে আবিষ্কার করুন।
প্রকৃতির অপার বিস্ময়: টাঙ্গুয়ার হাওর – বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট
টাঙ্গুয়ার হাওর, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলার এক প্রাকৃতিক রত্ন। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ‘রামসার সাইট’। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত, যা এর বিশালতা ও জীববৈচিত্র্যের ইঙ্গিত দেয়। বর্ষায় দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি এবং শীতে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত এই হাওর প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
১. তথ্য ও পরিচিতি (Informative)
অবস্থান: সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায়।
আয়তন: প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার (বর্ষাকালে প্রায় ২০,০০০ একর)।
রামসার সাইট: ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের ‘রামসার স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান (প্রথমটি সুন্দরবন)।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ECA): জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ১৯৯৯ সালে এটিকে ‘Ecologically Critical Area’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
জীববৈচিত্র্য: এই হাওর প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০-এর বেশি সরীসৃপ এবং ২৫০ প্রজাতিরও বেশি পাখির (বিশেষত শীতকালে অতিথি পাখির) নিরাপদ আবাসস্থল। এখানে হিজল-করচ গাছের সুবিস্তৃত জলাবন হাওরকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
২. প্রকৃতির সৌন্দর্য ও আকর্ষণ (Beauty)
টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য একেক ঋতুতে একেক রূপ নেয়।
বর্ষাকাল: বর্ষায় হাওর পরিণত হয় এক বিশাল জলরাশিতে, যাকে অনেকে ‘মিঠাপানির সমুদ্র’ বলে থাকেন। এ সময় মেঘ আর জলের খেলা, আকাশের প্রতিচ্ছবি এবং পানির উপরে জেগে থাকা সবুজ গ্রামগুলো (যা দ্বীপের মতো দেখায়) এক মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি করে। ডুবন্ত হিজল-করচ বন তখন জলবনের রূপ নেয়।
শীতকাল: শীতকালে পানি কমে যাওয়ায় ছোট ছোট বিল ও নলখাগড়ার স্তূপ দেখা যায়। এই সময় হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমনে হাওর মুখরিত হয়ে ওঠে, যা পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বিরল প্রজাতির প্যালাসার ফিশ ঈগলও এখানে দেখা যায়।
অন্যান্য দর্শনীয় স্থান: হাওর ভ্রমণের সময় আশেপাশের আরও কিছু মনোমুগ্ধকর স্থান ঘুরে দেখা যায়, যেমন:
শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক): মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই লেকের নীল জল ও পাহাড়ি দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম।
যাদুকাটা নদী: মেঘালয় থেকে নেমে আসা এই নদীর স্বচ্ছ নীল জলরাশি এবং এর তীরবর্তী বারিক টিলা ও শিমুল বাগান (বিশেষ করে বসন্তে লাল ফুলে ঢাকা) ভ্রমণকারীদের প্রধান আকর্ষণ।
🛶 কি কি করা যায়
নৌকা ভ্রমণ: ভাড়া করা যায় হাউসবোট বা বড় নৌকা। দিনভর কিংবা রাতে থেকে হাওরের ভেতরে ঘোরা যায়।
পাখি দেখা: শীতে অতিথি পাখিরা ভিড় করে, পাখিপ্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থান।
গ্রাম ভ্রমণ: হাওরের ভেতরের চরম দুর্গম কিন্তু দৃষ্টিনন্দন গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়।
ছবি তোলা: প্রকৃতি, পাখি, জলরাশির মাঝে অসাধারণ ফটোগ্রাফির সুযোগ।
৩. যাতায়াত ব্যবস্থা (Transportation)
টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে যেতে হলে প্রথমে সুনামগঞ্জ শহরে পৌঁছাতে হবে।
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ:
বাস: প্রতিদিন ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে মামুন, এনা ও শ্যামলী পরিবহণের বাস সরাসরি সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এবং মহাখালী থেকে ছেড়ে যায় এনা পরিবহণের বাস। এসব এসি/নন-এসি বাসে জনপ্রতি টিকেট ৭০০-১,০৫০ টাকা লাগে। আর সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে (সময়: প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা)।
ট্রেন: ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ নেই। ট্রেনযোগে মোহনগঞ্জ এসে সেখান থেকে সড়কপথে মধ্যনগর ঘাট হয়েও হাওরে যাওয়া যায়।
সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ:
সিলেটের কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ড থেকে সুনামগঞ্জ যাবার লোকাল নীলাদ্রি এসি বাস, ও লোকাল বাস পাওয়া যায়। নীলাদ্রি এসি বাস ১৬০-২০০ টাকা। লোকাল ১৬০ টাকা। সুনামগঞ্জ যেতে ১-৩০ ঘন্টার মত সময় লাগবে। অথবা চোহাট্টা থেকে সুনামগঞ্জ যাবার নুহা , কার গাড়ি তে ২০০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়।
সুনামগঞ্জ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর:
সুনামগঞ্জ থেকে লেগুনা/সিএনজি/বাইক করে তাহিরপুরে সহজেই যাওয়া যায়। তাহিরপুরে নৌকা ঘাট থেকে সাইজ এবং সামর্থ অনুযায়ী আধুনিক হাউসবোট নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে পারবেন। এবং রাত্রিযাপন ও করতে পারবেন হাউসবোটে। যেতে সময় লাগবে ( প্রায় ১ ঘণ্টা)।
তাহিরপুর ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা আধুনিক হাউসবোট ভাড়া করে হাওরের মূল অংশে প্রবেশ করতে হয়।
ভ্রমণের সেরা সময়:
বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর): দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি ও জলজ সৌন্দর্য উপভোগের জন্য।
শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি): অতিথি পাখির সমারোহ ও শান্ত পরিবেশ উপভোগের জন্য।
৪. ইতিহাস ও ঐতিহ্য (History)
টাঙ্গুয়ার হাওরের ইতিহাস কেবল প্রকৃতির নয়, মানব বসতি ও সংরক্ষণেরও।
প্রাচীন পরিচয়: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরকে তার নয়টি ‘কান্দা’ (ভূমিতে) এবং ছয়টি ‘বিল’ (জলাশয়ে) এর জন্য ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামে ডাকা হতো। এই অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু, গারো, হাজং, খাসি ও কোচ জাতির মানুষের বসবাস ছিল।
ঔপনিবেশিক যুগ: একসময় এই হাওরটি জমিদারদের বিনোদনের স্থান ছিল, যেখানে তারা পাখি শিকার করতেন।
সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বিশ শতকের শেষের দিকে পরিবেশগত অবনতি, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং বন উজাড়ের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়:
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার হাওরটিকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) হিসেবে ঘোষণা করে এবং দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির অবসান ঘটায়।
২০০০ সালে এটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে ‘রামসার সাইট’ এর মর্যাদা লাভ করে, যা এর পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।
টাঙ্গুয়ার হাওর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। এর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস এবং জীববৈচিত্র্য এটিকে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে।